পোস্টগুলি

জামালপুরের নকশীকাঁথা: সেলাইয়ের ফোঁড়ে গাঁথা লোকজ শিল্প

ছবি
  বাংলার গ্রামীণ জীবনে নকশীকাঁথা কেবল একটি প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী নয়; এটি নারীর অনুভব, স্মৃতি ও সৃজনশীলতার এক নীরব ভাষা। জামালপুর জেলার নকশীকাঁথা সেই ভাষাকেই বহন করে চলেছে যুগের পর যুগ। সাদামাটা কাপড়ের ওপর সূচের আঁচড়ে ফুটে ওঠা ফুল, লতা, পাখি কিংবা জ্যামিতিক নকশা, সব মিলিয়ে জামালপুরের নকশীকাঁথা হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের লোকজ শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। জামালপুর জেলার গ্রামীণ সমাজ মূলত কৃষিনির্ভর। এই কৃষিভিত্তিক জীবনের অবসরে, বিশেষ করে নারীদের হাতে জন্ম নেয় নকশীকাঁথার মতো শিল্পকর্ম। পুরোনো শাড়ি, লুঙ্গি কিংবা ধুতি পুনর্ব্যবহার করে তৈরি করা কাঁথার প্রতিটি সেলাইয়ের ফোঁড়ে লুকিয়ে থাকে সংসারের গল্প, ব্যক্তিগত অনুভূতি আর প্রজন্মান্তরের স্মৃতি। নকশীকাঁথার নকশা ও বৈশিষ্ট্য জামালপুরের নকশীকাঁথায় সাধারণত দেখা যায় ফুল-লতা, সূর্য, চাঁদ, পদ্ম, মাছ, পাখি ও নানা জ্যামিতিক নকশা। এসব নকশা কেবল শৈল্পিক নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের প্রতীক। সূর্য ও চাঁদ জীবনের ধারাবাহিকতা বোঝায়, মাছ নির্দেশ করে প্রাচুর্য, আর ফুল-লতা প্রকাশ করে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক। এখানকার নকশীকাঁথার একটি বিশেষ বৈশিষ্...

মাটির শিল্পে ঢাকার ঐতিহ্য: ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের গল্প

ছবি
  মাটির শিল্পে ঢাকার ঐতিহ্য: ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের গল্প  ঢাকা শুধু একটি শহরের নাম নয়, এটি এক জীবন্ত ইতিহাস, এক ঐতিহ্যের আধার, এক শতাব্দীর প্রাণস্পন্দন। এই শহর একদিন ছিল সুবর্ণযুগের রাজধানী, ছিল মসলিনের মোহনীয় সূতিকাগার, মসজিদের নগরী, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের মিলনস্থল। মুঘল আমল থেকে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ, পাকিস্তানি শাসন থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হওয়া পর্যন্ত, প্রতিটি পর্বে ঢাকা তার নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখেছে।  বর্তমানে ঢাকার আকাশছোঁয়া ভবন আর কংক্রিটের এই নগরের যান্ত্রিক জীবনের মধ্যেও এখনো লুকিয়ে আছে সেই প্রাচীন শিল্পের নির্যাস। বলছি মৃৎশিল্পের কথা, যা সময়ের হিসেবকে অস্বীকার করে টিকে আছে মানুষের সৃজনশীলতার নিদর্শন হয়ে। ঢাকা জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কুমার পল্লিগুলো সেই হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। মাটির তৈরি হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ, রঙিন ট্যাপা পুতুল কিংবা শৈল্পিক বাসনপত্র শুধু গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী নয়, এগুলো একেকটি কালের সাক্ষর, একেকটি গল্প।    ঢাকার মৃৎশিল্পের প্রাচীন ঐতিহ্য  ঢাকার মৃৎশিল্পের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। বলা হয়ে থাকে,...

ঝালকাঠির গামছা: স্থানীয় কারুশিল্পে সময়ের ছাপ

ছবি
  ঝাল কাঠির গামছা: স্থানীয় কারুশিল্পে সময়ের ছাপ  বাংলাদেশ মানেই শ্যামল নদী, মাঠ ও মানুষের শ্রমে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ গৌরবময় ইতিহাস। দক্ষিণাঞ্চলের নদীবেষ্টিত জেলা ঝালকাঠি এই শ্যামলিমারই একটি সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। সুগন্ধা, বিষখালী ও ধানসিঁড়ি নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই জনপদ একসময় নৌবাণিজ্য, কৃষি ও গ্রামীণ শিল্পচর্চার জন্য সুপরিচিত ছিল। বরিশাল বিভাগের অন্তর্গত উপকূলীয় সমভূমির এই জেলা আয়তনে প্রায় ৭৪৮.৩২ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে বরিশাল, দক্ষিণ ও পশ্চিমে পিরোজপুর এবং পূর্বে বরিশাল ও পিরোজপুর জেলার সীমানায় এর অবস্থান।  ঐতিহাসিকভাবে ঝালকাঠি প্রাচীন বাংলার জনপদের ধারাবাহিক অংশ। নদীপথভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মধ্যযুগে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় এবং ব্রিটিশ আমলে এটি বরিশাল অঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ধারায় ১৯৮৪ সালে ঝালকাঠি জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং বর্তমানে চারটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। ‘ঝালকাঠি’ নামের উৎপত্তিও নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের কারণে। মরিচের ঝাল ও কাঠের ব্যবসাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাজার থেকেই নামটির প্রচলন হয়েছে বলে ঐতিহাস...

উপকূলের জীবিকার ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের শুঁটকি

ছবি
  উপকূলের জীবিকার ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের শুঁটকি কক্সবাজার জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এই জেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং সমুদ্রনির্ভর জীবনযাপনের জন্য পরিচিত। একসময় এ অঞ্চলের নাম ছিল পালংকী বা প্যালংকি। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স এখানে আরাকানিদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে একটি বাজার স্থাপন করেন। তাঁর নামানুসারেই স্থানটি ‘কক্সের বাজার’ নামে পরিচিত হয়ে পরবর্তীতে কক্সবাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।  ইতিহাসের ধারায় এই অঞ্চল আরাকান রাজ্য, মুঘল শাসন এবং পরে ব্রিটিশ শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৮৪ সালে কক্সবাজার পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জেলার আয়তন প্রায় ২,৪৯১.৮৬ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে চট্টগ্রাম, পূর্বে বান্দরবান ও মিয়ানমার এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর এই জেলার ভৌগোলিক অবস্থান নির্ধারণ করেছে। কক্সবাজার বর্তমানে ১১টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। অর্থনৈতিক দিক থেকে কক্সবাজার মূলত সমুদ্র, কৃষি ও পর্যটননির্ভর। মৎস্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতি...

বরগুনার মুগডাল - উপকূলীয় জনপদের সোনালী শস্য

ছবি
  বরগুনার মুগডাল: উপকূলীয় জনপদের সোনালী শস্য বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা বরগুনা। পলিবিধৌত উর্বর মাটি, লোনা বাতাসের পরশ আর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল সব মিলিয়ে এ জেলা কৃষি বৈচিত্র্যে অনন্য। বরগুনার কৃষি পণ্যের তালিকায় অনেক নাম থাকলেও যে পণ্যটি স্বাদে মানে এবং ঐতিহ্যে দেশজুড়ে সমাদৃত, তা হলো 'বরগুনার মুগডাল'। বিশেষ করে এই অঞ্চলের ‘সোনা মুগ’ ডাল তার চমৎকার সুগন্ধ এবং রান্নার পর মাখনের মতো মসৃণ টেক্সচারের জন্য বিখ্যাত।   ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট ও মাটির গুণাগুণ বরগুনা জেলা বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত। পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর এই তিন নদীর পলিমাটি বরগুনার জমিকে করেছে অত্যন্ত উর্বর। এখানকার মাটিতে লবণের একটি বিশেষ মাত্রা থাকে, যা মুগডালের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বরগুনার সদর উপজেলা, আমতলী, তালতলী এবং পাথরঘাটায় সবচেয়ে বেশি মুগডাল চাষ হয়। মূলত আমন ধান কাটার পর জমি যখন শুষ্ক হতে শুরু করে, ঠিক তখনই কৃষকরা মুগডাল বপন করেন। চাষাবাদ পদ্ধতি ও জাত বরগুনার কৃষকরা মূলত দুই ধরণের মুগডাল চাষ করেন একটি স্থানীয় জাত (সোনা মুগ) এবং অন্যটি উচ্চফলনশীল জাত (যেমন: বারি মুগ-৬)। তবে স...

ময়মনসিংহের সবুজ স্বপ্নের বোররচর - কৃষিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

ছবি
  ময়মনসিংহের সবুজ স্বপ্নের বোররচর:  কৃষিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত বাংলাদেশের কৃষিপ্রধান জেলাগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহ এক বিশেষ অবস্থান দখল করে আছে। এখানকার উর্বর ভূমি, ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটির দান, আর পরিশ্রমী কৃষকেরা মিলে গড়ে তুলেছেন এক সবুজ বিপ্লবের গল্প। ময়মনসিংহ জেলার সদর উপজেলায় অবস্থিত বোররচর এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ সবজি উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। এখানকার কৃষকদের পরিশ্রম আর সাফল্যের ফলে প্রতিদিন শত শত ট্রাকভর্তি টাটকা সবজি পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত ঢাকার কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো প্রধান পাইকারি বাজারগুলোতে। ময়মনসিংহের বোররচরের কৃষকেরা এই শাকসবজি চাষ করে শুধু নিজেদের জীবনযাত্রা পরিবর্তন করেননি, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ব্যাপক অবদান রাখছেন। প্রতিদিন প্রায় ১৯ হাজার মণ সবজি বেচাকেনা হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১.৫ কোটি টাকা। আর মৌসুমের শীর্ষ সময়ে এ লেনদেন শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ এক অনন্য অর্জন, যা শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কৃষি উন্নয়নের এক নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা জানব ময়মনসিংহের বোররচরে...